কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগের উন্মাদনা নিয়ে বছর শুরু করেছে আর্থিক বাজার। এ উন্মাদনাসৃষ্ট মূল্যস্ফীতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শিগগিরই বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে বলে আশঙ্কা অনেক বিশ্লেষকের। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি থেকে বের হয়ে আসছে। সুদহার হ্রাস ও সরকারের প্রণোদনা মিলিয়ে বাজারে অর্থপ্রবাহ আরো বাড়তে যাচ্ছে। এর মধ্যেই প্রযুক্তি খাতের মারাত্মক বিনিয়োগ ক্ষুধা, বিশেষ করে ডাটা সেন্টার নির্মাণ ও উন্নত চিপ ব্যবহার, ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট বাজারে নতুন করে মূল্যচাপ বাড়ার কারণ হয়ে উঠতে পারে, যা প্রভাবিত করতে পারে ভোক্তাপণ্যের বাজারকেও। খবর রয়টার্স।
তবে এ মূল্যস্ফীতির প্রতিক্রিয়া বাজারে মারাত্মক দ্বিমুখী সংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এআই খাতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ বড় ধরনের মূল্যস্ফীতি তৈরি করলে তা নিয়ন্ত্রণে নেয়ার নীতিগত পদক্ষেপও বাজারকে আরো চাপে ফেলে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আবারো সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ধারায় ফিরে যেতে পারে, যার প্রভাবে আর্থিক বাজারে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিগত ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত বছর মার্কিন শেয়ারবাজারের মোট আয়ের অর্ধেকের উৎস ছিল ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন নামে পরিচিত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। দুই অংকের প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে শেয়ারবাজার সূচক। এআই নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ও শিথিল হতে থাকা মুদ্রানীতির সুবাদে ইউরোপ ও এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজার সূচকগুলো রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে।
ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদহার আরো কমানোর প্রত্যাশা গত বছর মার্কিন বন্ডের দাম আকাশচুম্বী করে তোলে। বন্ড বাজারে পাঁচ বছরের মধ্যে সেরা বার্ষিক পারফরম্যান্সের সুবিধা তুলে নিয়েছেন মার্কিন ট্রেজারিতে বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু দেশটিতে মূল্যস্ফীতি এখনো ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরই রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনের দিনগুলোয় এ লক্ষ্য অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এআই খাতের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে চলতি বছর বড় অংকের প্রণোদনা ঘোষণা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপান সরকার। একই সঙ্গে এআই-বুম বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে পুনরায় গতিশীল করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আবার একই সঙ্গে তা মূল্যস্ফীতিকেও দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার হ্রাসের চলমান প্রবণতা থামিয়ে দিতে পারে। তখন এআই খাতে বিনিয়োগের জন্য বাজারে কম সুদে অর্থ পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
রয়্যাল লন্ডন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের মাল্টি-অ্যাসেট বিভাগের প্রধান ট্রেভর গ্রিথম বলেন, ‘এআই বাবলকে ফাটিয়ে দিতে পারে এমন যে পিনের কথা ভাবা হচ্ছে, সম্ভবত কঠোর আর্থিক নীতিই সে পিন হতে যাচ্ছে।’
অবশ্য ট্রেভর গ্রিথম নিজেই এখনো বড় প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ার ধরে রেখেছেন। তবে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাড়লে অবাক হবেন না বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্যমতে, আর্থিক নীতি কঠোর হলে মুলধন ঝুঁকিতে থাকে এমন স্পেকুলেটিভ প্রযুক্তি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমবে। অন্যদিকে ঝুঁকিমুক্ত এআই প্রকল্পে ব্যয় বাড়বে এবং প্রযুক্তি কোম্পানির মুনাফা ও শেয়ারদরে এটি প্রভাব ফেলবে।
মাইক্রোসফট, মেটা ও অ্যালফাবেটের মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলো নতুন ডাটা সেন্টার নির্মাণে মাল্টিট্রিলিয়ন ডলার খরচের প্রতিযোগিতা করছে। এটিও মূল্যস্ফীতিতে ভূমিকা রাখছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব প্রকল্প জ্বালানি ও উন্নত চিপের ব্যবহার দ্রুত বাড়াচ্ছে।
মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষক এন্ড্রু শিটস বলেন, ‘আমাদের পূর্বাভাসে খরচ বাড়ছে, কমছে না। কারণ চিপ খাত ও বিদ্যুৎ ব্যয় মূল্যস্ফীতির লক্ষণ দেখাচ্ছে।’
তার মতে, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ মার্কিন ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যের চেয়ে বেশি হবে। এর আংশিক কারণ এআই খাতে করপোরেট বিনিয়োগ।
জেপি মরগানের ক্রস-অ্যাসেট স্ট্র্যাটেজি প্রধান ফাবিও বাসি বলেন, ‘চিপের দাম কম বা বেশি, যা-ই হোক না কেন; যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত শ্রমবাজার, প্রণোদনা ব্যয় ও এরই মধ্যে বাস্তবায়িত সুদহার হ্রাসকে অতিক্রম করে যাবে মূল্যস্ফীতি।’
অ্যাভিভা ইনভেস্টরস ২০২৬ সালের পূর্বাভাসে বলেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার কমানোর চক্র থামিয়ে দিলে বা সুদহার বাড়াতে শুরু করলে, সেটিই বাজারের প্রধান ঝুঁকি হয়ে দেখা দিতে পারে। কারণ এআই খাতে বিনিয়োগ এবং ইউরোপ ও জাপানে সরকারের প্রণোদনা ব্যয়ের কারণে মূল্যচাপ তৈরি হচ্ছে।
বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মার্সার সরাসরি ৬৮৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ পরিচালনা করে। পাশাপাশি সম্মিলিতভাবে ১৬ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরামর্শক সেবাও দিচ্ছে। মার্সারের ইউরোপীয় অর্থনীতি ও ডাইনামিক অ্যাসেট অ্যালোকেশন বিভাগের প্রধান জুলিয়াস বেনডিকাস বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি আবার ফিরে এসেছে। এটি আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।’
বাজারে এরই মধ্যে এআই খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ব্যাপকভাবে ব্যয় বাড়ার তথ্য প্রকাশের পর গত মাসে ওরাকলের শেয়ারদরে পতন ঘটে। মুনাফার মার্জিন কমতে পারে এমন পূর্বাভাসের পর ব্রডকমের শেয়ারদরও কমেছে।
পারসোনাল কম্পিউটার নির্মাতা এইচপির পূর্বাভাস অনুসারে, চলতি বছর ডাটা সেন্টারের চাহিদার কারণে মেমরি চিপের খরচ বাড়বে। ফলে কোম্পানির মূল্য ও মুনাফায় চাপ তৈরি হবে।
ডয়চে ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুসারে, এআই ডাটা সেন্টারের মূলধন ব্যয় ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এসব প্রকল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ চিপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করতে পারে। এতে বিনিয়োগ খরচ বেড়ে হতে পারে আকাশছোঁয়া।
পরামর্শক সংস্থা এশিয়া গ্রুপের অংশীদার জর্জ চেনের মতে, খরচ বৃদ্ধি ও ভোক্তা মূল্যস্ফীতি এআই প্রকল্পের খরচ বাড়াবে। এটি বিনিয়োগকারীদের এআইনির্ভর আর্থিক পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে।